Saturday, July 20, 2024
HomeRecent Live Banglaঘূর্ণিঝড় কী ও কেন হয়, বাংলাদেশ কেন ঘূর্ণিঝড় প্রবণ?

ঘূর্ণিঝড় কী ও কেন হয়, বাংলাদেশ কেন ঘূর্ণিঝড় প্রবণ?

বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় বেশ নিয়মিত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ঘূর্ণিঝড় ক্ষয়ক্ষতি করলেও তাপমাত্রায় ভারসাম্য রাখতে এটিই প্রকৃতি বেশি জরুরি একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় কেন হয়? বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ ও এর আশেপাশের উপকূল সংলগ্ন এলাকায় কেন এত ঘনঘন ঘূর্ণিঝড় হয়? ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ কিভাবে হয়? ঘুর্ণিঝড়ের সতর্কতা সংকেত এর মানে কি? ঘর্ণিঝড় নিয়ে সব ধরনের তথ্য আজ আমরা জানাবো। যার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে আবহাওয়াবিদদের দেয়া তথ্য এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা থেকে। 

ঘূর্ণিঝড় কেন হয়?

ঘূর্ণিঝড়ের ইংরেজি সাইক্লোন শব্দটি এসেছে গ্রিক কাইক্লোস শব্দ থেকে। যার কুণ্ডলী পাকানো সাপ। দূর থেকে ঘূর্ণিঝড়ের কুণ্ডলী থেকেই হয়তো এই নামকরণ। এই ঝড় মূলত বিষুবরেখার চারপাশে গ্রীষ্মমন্ডলীয় সমুদ্রে তৈরি হয়, যাকে বলা হয় ট্রপিক্যাল সাইক্লোন বা ক্রান্তীয় এই ঝড়। বঙ্গোপসাগরেও গ্রীষ্মমন্ডলীয় সমুদ্রের অংশ। পৃথিবীর মাঝ বরাবর যে কাল্পনিক বিষুবরেখা সূর্যের আলো এই রেখার আশেপাশের অঞ্চলে সরাসরি পড়ে। এতে ওই অঞ্চলে সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা  অনেক বেড়ে যায়।এ উত্তাপে সমুদ্রের পানি বাষ্পীভূত হয়ে জলীয়বাষ্প আকারে হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠে যায়। তখন বায়ুর চাপ অনেক কমে যায়। আরো সহজ করে বললে জলীয় বাষ্প ঘনত্ব  হলো। 18 এবং বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব হল 28।

এখন বায়ুমণ্ডলের বেশি ঘনত্বের সাথে সমুদ্র উঠে আসা জলীয় বাষ্পের কম ঘনত্ব মিশলে বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব কমে যাবে  অর্থ্যাৎ বায়ুর চাপ কমে যাবে। এভাবে যত জলীয়বাষ্প উঠবে, বায়ুচাপ তত কমবে, একেই নিম্নচাপ বলে। আমরা জানি যে বাতাস উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে ধাবিত হয়। সহজ করে বললে, আপনি যদি একটি বেলুন ফুলানো বেলুন এর ভেতরে বাতাস উচ্চচাপ বা হাই প্রেসারে থাকে। বেলুনটি কোন ছিদ্র পেলেই সেটি বাইরে নিম্নচাপ বাতাসের সাথে মিশে যায়।

রিসেন্ট লাইভ খবর পেতে ফলো করুন আমাদের গুগল নিউজ চ্যানেল

আবহাওয়ার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়। দেখা যায়, সমুদ্রের যে অংশে নিম্নচাপ তৈরি হয় বা যে অংশের পানি জলীয় বাষ্প হয়ে উঠে যায় সেই ফাঁকা স্থান পূরণ করতে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর শীতল বাতাস এ নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে ধেয়ে আসতে থাকে। এই বায়ুপ্রবাহ আসার সময় ঘূর্ণন তৈরি হয়। স্যাটেলাইট ইমেজ থেকে দেখা যায়, এই ঘূর্ণন একদিকে সরে যেতে থাকে। এর কারণ হলো আমাদের পৃথিবী প্রতিনিয়ত নিজ অক্ষে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরছে। এ ঘোড়ার ফলে এক ধরনের ফোর্স তৈরি হয়, যাকে করিওলিস ফোর্স ফলে। এ ফোর্স সবচেয়ে বেশি থাকে পৃথিবীর মাঝ বরাবর বিষুবরেখার আশেপাশে।কেননা গোলাকার পৃথিবীর এই অংশটির সবচেয়ে বেশি স্মীত।

এর কারনে পূর্ব অঞ্চলের বাতাস প্রবাহ উত্তর গোলার্ধের ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধের বাম দিকে সরে যায়।এ কারণে উত্তর গোলার্ধের ঘূর্ণন ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধের ঘূর্ণন ঘড়ির কাটার দিকে ঘুড়ে। পড়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে।  বাংলাদেশের অবস্থান বিষুবরেখার উত্তরে বা উত্তর গোলার্ধে হওয়ায় এ অঞ্চলের এই ঝড় ডান দিকে সরে এবং ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ঘুরতে ঘুরতে এগোতে থাকে।

ঝড়বৃষ্টি কেন হয়?

 গরম বাতাস ওপরে ওঠার ফলে সেই কম বায়ুচাপের এলাকায় যখন অপেক্ষাকৃত উচ্চ বায়ুচাপ প্রবেশ করে একপর্যায়ে সেটিও গরম হয় উপরে উঠে যায়।এভাবে একটি চক্র তৈরি হয়। গরম বাতাস ওপরে উঠে ঠান্ডা হওয়ার ফলে মেঘ তৈরি করে এবং ক্রমাগত গরম ঠান্ডাও বাতাস ওঠানামার কারণে একটি ঘূর্ণন সৃষ্টি হয়। এ ঘূর্ণন  তখন বাতাস এবং মেঘ নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আরো শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে । এতে এই ঝড়টি উপকূলের দিকে এগিয়ে এলে ঝড় বৃষ্টি দেখা দেয়। ঠান্ডা ও গরম বাতাসে এ ওঠানামা যত বেশি হয় ততই ঘুনি ঝড়ের তীব্রতা ও আকার বাড়ে। আবেদন জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাস 300 থেকে 15 কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তবে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রকে বলা হয় ঘূর্ণিঝড়ের চোখ। সেখানে বাতাস খুব শান্ত থাকে।

তবে সমুদ্রে হঠাৎ এ কোন ঘূর্ণিঝড় হয় না। এর আগে লঘুচাপ, সুস্পষ্ট লঘুচাপ, নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ এই ধাপগুলো পার হতে হয়। মূলত ঘুরে থাকা বায়ুর গতির ওপর নির্ভর করে এটি কোন ধাপে আছে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে, বাতাসের গতিবেগ এর উপর ভিত্তি করে ঘূর্ণিঝড়কে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়। বাতাস ৬২ কি.মি. বা এর কম বেগে ধাবিত হলে, তাকে মৌসুমী ঝড় বলা হয়। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার হলে তাকে বলে ঘূর্ণিঝড়। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় 88 থেকে ১১৭ কিলোমিটার হলে তীব্র এই ঝড় এবং বাতাসের গতিবেগ ঘন্টায় ১১৮ থেকে ২১৯ কিলোমিটার হলে প্রবল এই ঝড় বলা হয়। এবং বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় যদি 220 কিলোমিটার উপরে হয়, তখন তাকে বলা হয় সুপার সাইক্লোন। 

বাংলাদেশ কেন এতো দূর্যোগ প্রবন?

পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোড়ার কারণে সূর্য একসময় উত্তর গোলার্ধে থাকে, আরেক সময় থাকে দক্ষিণ গোলার্ধে। সূর্য যখন দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে উত্তর গোলার্ধের দিকে যেতে থাকে, তখন বাংলাদেশের গরমকাল শুরু হয় এবং ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা বাড়ে। সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা  26  সেলসিয়াসের উপরে হলে ঘূর্ণিঝড় ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বঙ্গোপসাগরের গড় তাপমাত্রা এর চাইতেও অনেক বেশি থাকছে। বাংলাদেশ এজন্য মার্চ, এপ্রিল,মে  এবং অক্টোবর-নভেম্বর এ ২ মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় হয়। তাপমাত্রা যত বেশি হবে সমুদ্র থেকে ততবেশি জলীয়বাষ্প উপরের দিকে উঠবে এবং বায়ুর চাপ ততবেশি কমবে এবং সমুদ্রের শক্তি ততো বাড়তে থাকবে। বাংলাদেশের উপকূলে দিকটি একটি ফানেলের মতো বা চং এর  মতো হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় এই স্থানে অনেকক্ষণ সময় আটকে থাকে, সেই সাথে 

বায়ুতাড়িত পানি গভীর সমুদ্র কম গভীর সমুদ্রের দিকে এবং সংকীর্ণ দিকে এগিয়ে আসতে থাকে।এতে পানি উপরের দিকে উঠে আসে। একেই জলোচ্ছ্বাস বলে। এ জলোচ্ছ্বাসের কারণে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়।

ঘূর্নিঝড়ের নামঃ

 কোন সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড় উৎপন্ন হচ্ছে তার ভিত্তিতে এর নামকরণ হয়। ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় বলে সাইক্লোন বা বাংলা যেটাকে বলা হয় ঘূর্ণিঝড়। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর এবং উত্তর পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের ঘূর্ণিঝড় কে বলা হয় হারিকেন, এবং উত্তর পশ্চিম সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় বলা হয় টাইফুন। বলা হয়, বাংলা শব্দ তুফান এই টাইফুন শব্দ থেকে এসেছে। এছাড়া প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের আলাদা আলাদা নাম আছে। সমুদ্রে কোন নিম্নচাপ অঞ্চলের বায়ু প্রবাহ ঘণ্টায় 62 কিলোমিটার অতিক্রম করলে সে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়।

আন্তর্জাতিক কমিটিগুলো আগে থেকেই নাম গুলো সারিবদ্ধ ভাবে ঠিক করা থাকে। 2004 সাল থেকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু করে। বাংলাদেশ, ভারত মিয়ানমার, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, ওমান এই ৮টি দেশের প্রত্যেকে একটি করে মোট 64 টি নাম প্রস্তাব করে। ওই তালিকায় আমপাল ছিল শেষ নাম। পরে 2020 সালে আগের আটটি দেশের সাথে আরও পাঁচটি দেশ মিলে অর্থাৎ মোট 13 দেশ তেরোটি করে 169 টির নাম জমা দেয়।

সতর্কতাঃ

 ঘূর্নিঝড় উপকূলের দিকে এগিয়ে আসলে পরিস্থিতি বুঝে সতর্ক সংকেত দেয়া হয়। মানুষকে সতর্ক করতে এমন এগারটি সংকেত রয়েছে। এক নম্বর দূরবর্তী সতর্ক সংকেত। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬১ কিলোমিটার হলে দূরবর্তী এলাকায় সামুদ্রিক ঝড়ের আশঙ্কা থাকে। এজন্য জাহাজকে সতর্ক করা হয় যে তারা ছেড়ে গেলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সম্মুখীন হতে পারে। দুই নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত। দূরের গভীর সাগরে একটি ঝড় সৃষ্টি হয়েছে সেখানে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় 62 থেকে 88 কিলোমিটার। এতে বন্দর ছেড়ে যাওয়া জাহাজ পথে বিপদে পড়তে পারে। তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত’। বন্দরে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে এবং বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় 40 থেকে 50 কিলোমিটার হতে পারে।

এতে বন্দরে নোঙ্গর করা জাহাজগুলো দুর্যোগে পড়তে পারে। 4 নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত। বন্দর ঘূর্ণিঝড় কবলিত বাতাসের সম্ভাব্য গতিবেগ ঘন্টায় 51 থেকে 61 টি কিলোমিটার। 5 নম্বর বিপদ সংকেত।বন্দর  ছোট বা মাঝারি তীব্রতর এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়বে। ঝড়ো বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় 62 থেকে 88 কিলোমিটার থাকবে। ঝড়টি বন্দরকে বামদিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করতে পারে। 6 নম্বর বিপদ সংকেত প্রায় 5 নম্বর বিপদ সংকেত এর মতই। তবে এ সংকেত এর পার্থক্য হল ঝড়টি বন্দরকে ডান দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।7 নম্বর বিপদ সংকেত।৭ নম্বর বিপদ সংকেত প্রায় 5/6 নম্বর বিপদ সংকেত এর মতইা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular